Error. Page cannot be displayed. Please contact your service provider for more details. (5)

বঙ্গোপসাগরে সম্পদের পাহাড়

আমাদের সমুদ্র মৎস্য সম্পদের আধার। মৎস্য সম্পদের পাশাপাশি সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে খনিজ সম্পদের পাহাড়। বাংলাদেশ দুই দফায় মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিজয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা আরও বেড়েছে। বিরোধ থাকাকালীন সুনির্দিষ্ট সীমানা না থাকায় বঙ্গোপসাগরে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন, গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণসহ সামগ্রিক কর্মকাণ্ড যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, তেমনি বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের সদস্যরাও তাদের দায়িত্ব পালনে এবং বিদেশি ট্রলার দিয়ে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ প্রতিরোধে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিল। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী ন্যায্যতার ভিত্তিতে ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক এলাকা ও তদূর্ধ্ব মহীসোপান এলাকা এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের সীমানার সঙ্গে যোগ হয়েছে। এসব এলাকায় প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর কোনো বাধা নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভূ-তাত্তি্বক গবেষণা সংস্থার (ইউএসজিএস) মতে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অবস্থিত গ্যাস ব্লকগুলোতে ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাসব্লকের ১০টি ভারত ও ১৮টি মিয়ানমার দাবি করে আসছিল। এসব ব্লকে বিভিন্ন সময় দেশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালাতে গেলেও সম্ভব হয়নি। ভারত ও মিয়ানমারের বাধার কারণে ফিরে আসতে হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের সমুদ্রবিষয়ক রায়ে এ বাধার অবসান ঘটেছে। ভারতের সঙ্গে আটটি ও মিয়ানমারের সঙ্গে ১৩টি তেল-গ্যাস ব্লক জিতেছে বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্জিত সমুদ্রসীমায় আনুমানিক ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) আর ভূ-সীমায় মজুদ রয়েছে ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমানে প্রতি বছর দেশে এক টিসিএফ গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সে হিসাবে আগামী ১২ বছর পর দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দেবে। সমুদ্রসীমায় নতুন গ্যাস ব্লক অর্জিত হওয়ায় সে গ্যাসের সংকট অনেক ক্ষেত্রেই কাটিয়ে উঠবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মাত্র দুটি ব্লক থেকে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, সমুদ্রের এই অপার সম্ভাবনাময় সম্পদকে কাজে লাগাতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এ পরিকল্পনায় সরকারি ও বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ সম্পদকে কাজে লাগানোর উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

অধ্যাপক মাকসুদ কামাল আরও বলেন, তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ অবকাঠামো তৈরি করেছে। আমাদেরও দেশের সমুদ্রসীমার তেল-গ্যাস আহরণে শীঘ্রই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে মূলত দুই ধরনের সম্পদ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে প্রাণিজ (লিভিং) ও অপ্রাণিজ (নন-লিভিং) সম্পদ। অপ্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, চুনাপাথর প্রভৃতি। খনিজের মধ্যে আরও রয়েছে ১৭ ধরনের খনিজ বালু। এর মধ্যে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট, মোনাজাইট, কায়ানাইট, লিকোঙ্নি উল্লেখযোগ্য। এ আটটি খনিজ বালু বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। এগুলোর দামও বেশি। বঙ্গোপসাগরের অর্জিত সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ১০ লাখ টন এসব খনিজ বালু আহরণ করা সম্ভব। এ ছাড়াও সাগরের তলদেশে ক্লেসার ডেপোজিট, ফসফরাস ডেপোজিট, এভাপোরাইট, পলিমেটালিক সালফাইড, ম্যাঙ্গানিজ নডিউল, ম্যাগনেসিয়াম নডিউল নামক খনিজ পদার্থ আকরিক অবস্থায় পাওয়া যাবে। এদের নিষ্কাশন করে লেড, জিংক, কপার, কোবাল্ট, মলিবডেনামের মতো দুষ্কর ধাতুগুলো আহরণ করা সম্ভব হবে। এসব দুষ্কর ধাতু উড়োজাহাজ নির্মাণ, রাসায়নিক কাজে এবং বিভিন্ন কলকারখানার কাজে ব্যবহার করা যাবে।

তবে তেল, গ্যাস, কয়লা, চুনাপাথরসহ এসব ধাতু অনবায়নযোগ্য। এসব থেকে প্রাপ্ত শক্তি একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে। বঙ্গোপসাগরের প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিও পাওয়া সম্ভব। বঙ্গোপসাগরের সি-বেডে রয়েছে অসংখ্য উদ্ভিদকূল (ফ্লোরা)। এ উদ্ভিদকূলকে ব্যবহার করে ওষুধ শিল্পে অনেক জীবনবিনাসী রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার ওষুধ আবিষ্কার করা যাবে।

এ ছাড়াও অর্জিত সমুদ্রসীমায় গ্রিন এনার্জিও মিলবে। এর মধ্যে উইন্ড এনার্জি, ওয়েভ এনার্জি, টাইডাল এনার্জি, ওশীন কারেন্ট উল্লেখযোগ্য। সাগরের বাতাসকে কাজে লাগিয়ে উইন্ড এনার্জি, তরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে ওয়েভ এনার্জি, জোয়ার-ভাটাকে কাজে লাগিয়ে টাইডাল এনার্জি তৈরি করা যাবে। এসব এনার্জি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগানো সম্ভব। আমাদের পাশর্্ববর্তী দেশ ভারত উইন্ড এনার্জিকে কাজে লাগিয়ে মোট ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা তাদের মোট বিদ্যুৎ শক্তির প্রায় ১০ শতাংশ। আর এটি বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুৎ শক্তির প্রায় তিনগুণেরও বেশি।

এ ছাড়া সমুদ্রের প্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে মাছ, শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপ, কাঁকড়া, কুমির, হাঙ্গর, তিমি ইত্যাদি। দেশে বছরে মোট ৩৩ লাখ টন মৎস্য সম্পদ আহরণ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ছয় লাখ টনই আসে সমুদ্র থেকে। ট্রলার ও নৌকা ব্যবহার করে আমাদের দেশের জেলেরা শুধু অগভীর সমুদ্র থেকে এসব মৎস্য সম্পদ আহরণ করে থাকে। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ থাকায় গভীর সমুদ্রে গিয়ে মৎস্য আহরণ সম্ভব হয়নি। সমুদ্রজয়ের ফলে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকায় এখন আরও ১৫০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমা যোগ হওয়ায় এসব এলাকায়ও প্রাণিজ সম্পদ আহরণ সম্ভব হবে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ মৎস্য আহরণ করে জীবিকানির্বাহ করে। সমুদ্রসীমা বেড়ে যাওয়ায় মৎস্য সম্পদ আহরণের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি দেশের জনগোষ্ঠীকে বেকারত্বের হাত থেকেও রক্ষা করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক কাউসার আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অর্জিত সমুদ্রসীমায় কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা জানতে দ্রুত জরিপ চালাতে হবে। সরকার জরিপ কাজ চালাতে আইডিবির সহায়তায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জরিপ জাহাজ ক্রয় করেছে। এর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালাতে শিপিং করপোরেশনকে ঢেলে সাজাতে হবে। এ ছাড়াও সম্ভাবনাময় এ সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোনো বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে সরকারি আনুকূল্য ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।

অধ্যাপক কাউসার নাইজেরিয়ার উদাহরণ দিয়ে আরও বলেন, বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি এখনো গরিব রাষ্ট্রই রয়ে গেছে। তাদের অবস্থার উন্নয়ন করতে পারেনি। তারা তাদের সম্পদকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারেনি। গ্যাস খননের ক্ষেত্রে দেশাত্দবোধ দেখাতে গিয়ে গ্যাসক্ষেত্র ধ্বংস করা যাবে না। দেশীয় কোম্পানি বাপেঙ্ সাগরের তলদেশের তেল-গ্যাস আহরণে অভিজ্ঞ নয়।

Leave a Reply

*

captcha *